বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
bartika24

বণিক বার্তা

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েনে ক্ষতি কার, লাভ কার?

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েনে ক্ষতি কার, লাভ কার?

শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা এখন আর শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান কিংবা তার বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কে। সাম্প্রতিক সময়ে নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সেই অস্বস্তিকে আরও প্রকাশ্য করেছে। একই সঙ্গে সামনে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক যদি দীর্ঘদিন অবিশ্বাস ও টানাপোড়েনের মধ্যে থাকে, তাহলে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে কে?

গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় ক্ষমতাচ্যুত ও দেশত্যাগী শেখ হাসিনার একটি অডিও বক্তব্য প্রচার করা হয়। এ ঘটনায় বাংলাদেশ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অনুষ্ঠানের নিন্দা করেছে। ঢাকার পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে, ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে ভারত বলেছে, ওই অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে দেশটির সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং এফসিসি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ব্যাখ্যা যা-ই হোক, বাস্তবতা হলো—এর ফলে আগে থেকেই কঠিন অবস্থায় থাকা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।

ভারত থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আপত্তি জানানোর পূর্ণ অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। তাকে কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রেও এ ঘটনা ঢাকার অবস্থানকে আরও জোরালো করতে পারে। কিন্তু এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান করা এবং সেই সমস্যাকেই দুই দেশের পুরো সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা এক বিষয় নয়।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কোনো এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি, আবার একজন ব্যক্তিকে ঘিরে এর ভবিষ্যৎও নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাণিজ্য, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি, পরিবহন, যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের মতো বহু দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ।

এসব ক্ষেত্রে নিয়মিত যোগাযোগ ও সহযোগিতার বিকল্প নেই। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। একইভাবে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা সমস্যার সমাধানেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর আলোচনা প্রয়োজন। বাস্তবতা হলো, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশ ও ভারত কোনো দেশই অন্য দেশকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলতে পারে না।

জুলাইয়ের শেষ দিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দুই দেশের কোনো সমস্যাই সমাধানের বাইরে নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে গঠনমূলকভাবে এগিয়ে নিতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এরই মধ্যে একাধিকবার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার পরিবারকে দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারত যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। এরপর আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

এই আমন্ত্রণগুলো বাংলাদেশের জন্য নিছক আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়। বরং এগুলো ঢাকার কূটনৈতিক পরিপক্বতা ও জাতীয় স্বার্থকে কতটা বাস্তববাদীভাবে সামনে রাখা যায়, তারও পরীক্ষা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখনো নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি। ব্রিকস সম্মেলনের আমন্ত্রণ তাই ভারতের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ পুনর্গঠনের একটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।

এই সফরকে শুধু দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে না দেখে একটি বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। ফলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সরাসরি আলোচনা ও যোগাযোগের একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অবশ্য এ সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে। দেশের কট্টরপন্থী রাজনৈতিক মহল প্রশ্ন তুলতে পারে—শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করার সময় তারেক রহমানের ভারত সফরের যৌক্তিকতা কী? কিন্তু অন্যদিকে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলে এমন ধারণাও তৈরি হতে পারে যে শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিরোধই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সামগ্রিক যোগাযোগের পথ নির্ধারণ করছে।

একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের কূটনীতি এমন হওয়া উচিত নয়। জাতীয় স্বার্থ যেখানে জড়িত, সেখানে আপত্তি ও মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগের পথ খোলা রাখাই অধিক কার্যকর।

শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ ভারত পেয়েছে এবং নয়াদিল্লি বিষয়টি নিজেদের আইনি কাঠামোর আলোকে পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন অনিশ্চিত থাকলে বাংলাদেশে সন্দেহ ও অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।

শেখ হাসিনা নিজেও একাধিকবার বলেছেন, তিনি ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফিরতে চান। তিনি দেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও মামলার বিষয়ে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। বিচারিক প্রক্রিয়াও নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত এটি বাংলাদেশের আদালত ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিষয়—ভারতের নয়।

তবে শেখ হাসিনা যতদিন ভারতে থাকবেন, ততদিন তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে থাকবেন। শুধু কঠোর বিবৃতি দিয়ে কিংবা ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ সীমিত রেখে এই বাস্তবতা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

বরং সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার অবস্থান ভারতের কাছে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারে। একই সঙ্গে অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সমস্যার ক্ষেত্রেও নিজেদের স্বার্থ আদায়ের সুযোগ বাড়াতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি আবারও একই জায়গায় ফিরে আসে—বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিন খারাপ থাকলে লাভবান হবে কে?

নিশ্চিতভাবেই দুই দেশের রপ্তানিকারকরা নয়। আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ভোক্তারাও নয়। নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা দরকার এমন ব্যবসায়ী, সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ কিংবা পানি বণ্টনের সমাধানের অপেক্ষায় থাকা জনগোষ্ঠীও নয়।

দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা কোনো দেশের নিরাপত্তার জন্যও ইতিবাচক নয়। বরং অবিশ্বাস যত বাড়বে, ততই অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সহযোগিতার সুযোগ সংকুচিত হবে।

লাভবান হতে পারে তারাই, যারা বিভাজন ও উত্তেজনা থেকে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চায়। দুই দেশের রাজনৈতিক কট্টরপন্থীরা তাদের মধ্যে অন্যতম। একই সঙ্গে বিভক্ত ও দুর্বল দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ খোঁজা বাইরের শক্তিগুলোরও এতে স্বার্থ থাকতে পারে।

তাই বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে না অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে হবে, না অকারণ বিরোধকে নীতিতে পরিণত করতে হবে। আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ নিজের জাতীয় স্বার্থ স্পষ্টভাবে তুলে ধরে ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারে। মতবিরোধ থাকবে, কঠিন প্রশ্নও থাকবে, কিন্তু যোগাযোগের দরজাও খোলা রাখতে হবে।

কারণ কূটনীতির অর্থ সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়; বরং মতবিরোধের মধ্যেও নিজের স্বার্থ রক্ষা করে সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়া।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক তাই কোনো একজন ব্যক্তির চেয়ে অনেক বড়। শেখ হাসিনার বিষয়টির একটি আইনি ও কূটনৈতিক সমাধান প্রয়োজন, কিন্তু সেটিকে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের একমাত্র নির্ধারক বানানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক যদি স্থায়ীভাবে খারাপ হয়ে যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে কারা—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ সেই তালিকায় বাংলাদেশ বা ভারত—কোনোটিকেই রাখার কারণ নেই। বরং দুই দেশের বিভাজন থেকেই সুবিধা নেবে তারা, যারা এই বিভাজনকে নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়।

আরও

১০০ ফিট সড়ক দখলদারদের হাতে, কর্তৃপক্ষ কি নির্বিকার?

বণিক বার্তা

১০০ ফিট সড়ক দখলদারদের হাতে, কর্তৃপক্ষ কি নির্বিকার?

রাজধানীর ভাটারা থানার মাদানী অ্যাভিনিউয়ের ১০০ ফিট সড়ক। নামেই ১০০ ফিট, বাস্তবে কোথাও কোথাও যান চলাচলের জায়গা অবশিষ্ট মাত্...

২০২৬-১০-১৯ ১৫:২৩

ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তনের মশাল জ্বালিয়েছে এবিজি স্পোর্টস সিটি

বণিক বার্তা

ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তনের মশাল জ্বালিয়েছে এবিজি স্পোর্টস সিটি

দেশের ক্রীড়াঙ্গনে দীর্ঘদিনের অন্যতম সংকট ছিল আধুনিক অবকাঠামোর অভাব। আন্তর্জাতিক মানের মাঠ, উন্নত প্রশিক্ষণসুবিধা, খেলোয়া...

২০২৬-১০-১৮ ১৭:০৫

চিকিৎসাসেবা থেকে শিক্ষা সহায়তা: জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ২৭ বছর

বণিক বার্তা

চিকিৎসাসেবা থেকে শিক্ষা সহায়তা: জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ২৭ বছর

১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মানবসেবা ও জনকল্যাণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন (জেডআরএফ)। স্বাস্থ্...

২০২৬-১০-১৮ ১৪:৫৬

বসুন্ধরা গ্রুপের উপহারে ১০০ নারীর হাতে স্বাবলম্বিতার হাতিয়ার

বণিক বার্তা

বসুন্ধরা গ্রুপের উপহারে ১০০ নারীর হাতে স্বাবলম্বিতার হাতিয়ার

স্বামীকে হারানোর পর দুই সন্তানকে নিয়ে একাই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন রুমা। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে নানা প্রতিকূলতার সঙ...

২০২৬-১০-১৮ ১৩:১৫

গাড়ির বাজার ও দুই আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে মুখর আইসিসিবি

বণিক বার্তা

গাড়ির বাজার ও দুই আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে মুখর আইসিসিবি

রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) একই সময়ে চলছে তিনটি ভিন্ন খাতের প্রদর্শনী। নতুন ও ব্যবহৃত গাড়ি...

২০২৬-১০-১৮ ১৩:১২

মেরিটাইম প্রদর্শনী আর গাড়ির বাজারে সরগরম রাজধানীর আইসিসিবি

বণিক বার্তা

মেরিটাইম প্রদর্শনী আর গাড়ির বাজারে সরগরম রাজধানীর আইসিসিবি

এক ছাদের নিচে সামুদ্রিক শিল্পের আধুনিক প্রযুক্তি ও নানা ধরনের যানবাহন দেখার সুযোগ ঘিরে রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন স...

২০২৬-১০-১৮ ১৩:১০