বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
bartika24

চলতি বার্তা

‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ নিয়ে যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ নিয়ে যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের পর থেকে ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে প্রস্তাবিত ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ (সিএমবিসি) নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। এই করিডোর চীন, মিয়ানমান ও বাংলাদেশের মধ্যে আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অবশ্য কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই প্রকল্পে চূড়ান্ত সম্মতি দেওয়ার আগে বাংলাদেশকে এর অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।

গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’-এর প্রস্তাবটি নতুন করে আলোচনায় আসে। ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর ওই সফরেই ঢাকা ও নিজেদের তৃতীয় যৌথ ইশতেহার জারি করে বেইজিং। সেই আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল এই অর্থনৈতিক করিডোর। প্রকল্পটির মূল পরিকল্পনা হলো— সড়ক ও রেলযোগাযোগের মাধ্যমে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং শহরের সঙ্গে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের বন্দরগুলোর সংযোগ স্থাপন করা।

চীনের জন্য এই করিডোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর একটি সংক্ষিপ্ত পথ মিলবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশও এই করিডোরের মাধ্যমে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বর্ধিত বিনিয়োগ, বাণিজ্যের প্রসার এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারে।

তবে এই উদ্যোগটি একেবারেই নতুন নয়। ১৯৯৯ সালে প্রস্তাবিত 'বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার' (বিসিআইএম) করিডোরেরই এটি একটি পরিবর্তিত রূপ। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) এবং অঞ্চলে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কারণে পরবর্তী সময়ে এই প্রকল্প থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয় প্রতিবেশী দেশ ভারত। ফলে ভারতকে ছাড়াই এখন মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে নিয়ে এই করিডোর এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে চীন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই করিডোরের প্রস্তাব বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ এনেছে। আবার এক কঠিন সমীকরণের মুখোমুখিও দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কারণ, বাংলাদেশকে একই সঙ্গে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য প্রধান অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হচ্ছে।

অবশ্য চীন এই প্রকল্প এগিয়ে নিতে বেশ তৎপর। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানান, চীনা কর্মকর্তারা এই করিডোরের একটি কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) তৈরি করছেন। পাশাপাশি মিয়ানমারে নিজেদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় দেশটির বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে বেইজিং।

চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেশ জোরালো। তবে দুই দেশের বাণিজ্য চিত্র মারাত্মকভাবে ভারসাম্যহীন। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, চীন থেকে প্রায় ২২.৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এর বিপরীতে চীনে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ মাত্র ১.২ বিলিয়ন ডলার। ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ২১.৭ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পারবে না। নিজস্ব শিল্প সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি পণ্য বাড়াতে না পারলে এই করিডোর ব্যবহার করে বাংলাদেশ উল্টো আরও বেশি চীনা পণ্যের বাজারে পরিণত হতে পারে।

তাদের মতে, বাংলাদেশের রফতানি আয় এখনো তৈরি পোশাক ও শ্রমঘন শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, উন্নত প্রযুক্তি, সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) এবং বৃহৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে আধিপত্য ধরে রেখেছে চীন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যোগাযোগ অবকাঠামো অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি অংশ মাত্র। বাংলাদেশ পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামো খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি করেছে। তবে পণ্য পরিবহন, লজিস্টিকস সাপোর্ট, গুদামজাতকরণ, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থার (মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট) মতো খাতগুলোয় এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। এই অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা না গেলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক উৎপাদন বা বাণিজ্য কেন্দ্র হওয়ার বদলে কেবল একটি ‘ট্রানজিট রুট’ বা পারাপারের পথ হিসেবেই রয়ে যাবে।

আর্থিক সংশ্লেষের বিষয়টিও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য বিপুল বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হওয়া জরুরি। অর্থনীতিবিদদের মতে, যেকোনো বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বন্দর আধুনিকীকরণ, রফতানি অবকাঠামো, জলবায়ু সহনশীলতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও শিল্প উন্নয়নের মতো জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়গুলোকে আগে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

ভাবাচ্ছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সংকট

এই করিডোর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। প্রস্তাবিত রুটটি মিয়ানমারের যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইন রাজ্যের ওপর দিয়ে যাবে। অথচ সেখানে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে গৃহযুদ্ধ চলছে। বর্তমানে করিডোরের প্রস্তাবিত অঞ্চলের একটি বড় অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে বা প্রভাবে রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি কোনো অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক যোগাযোগের যেকোনো উদ্যোগে যেন রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়াটি কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত বা উপেক্ষিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ভেতর দিয়ে অবকাঠামো তৈরি হলে তা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য আয়ের নতুন উৎস তৈরি করতে পারে, যা তাদের পরোক্ষভাবে আরও শক্তিশালী করবে। তাই চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটি ব্যাপকভিত্তিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন আবশ্যক।

করিডোরটিকে ঘিরে ভূরাজনীতির সমীকরণ

করিডোরটিকে ঘিরে জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে। কারণ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সংবেদনশীল সীমান্ত এবং কৌশলগত ‘শিলিগুড়ি করিডোর’-এর কাছাকাছি চীনের এই উপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়াদিল্লি। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি ঢাকাকে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার তাগিদ দিয়ে আসছে ওয়াশিংটন।

তবে বিশ্লেষকদের পরামর্শ হলো, কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ না হয়ে বাংলাদেশের উচিত কেবল নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই এই প্রস্তাবের লাভ-ক্ষতি বিচার করা। লাওস-চীন রেলওয়ে, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপেক) কিংবা শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের মতো প্রকল্পগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। এসব উদাহরণ দেখায় যে, কেবল অবকাঠামো তৈরি করলেই অর্থনৈতিক সাফল্য আসে না। এর জন্য স্বচ্ছ অর্থায়ন, নিখুঁত সম্ভাব্যতা যাচাই, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি থাকা সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ কী হতে পারে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের উচিত একবারে বড় ঝুঁকিতে না গিয়ে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া। আপাতত ছোট ও বাস্তবসম্মত যোগাযোগ প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে চীনের প্রস্তাবিত এই করিডোরটিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি কেবল আমদানির ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশে রফতানিমুখী চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে, ঋণ স্থায়িত্ব (ডেট সাসটেইনেবিলিটি), পরিবেশ সুরক্ষা, শ্রমের মান এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব একটি সুস্পষ্ট জাতীয় নীতিমালা থাকা উচিত, যাতে ভবিষ্যৎ যেকোনো যোগাযোগ প্রকল্প দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।

সব মিলিয়ে, এই করিডোর আঞ্চলিক যোগাযোগে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার সম্ভাবনা রাখলেও এর চূড়ান্ত সাফল্য কেবল সড়ক বা রেললাইনের ওপর নির্ভর করছে না। বরং তা নির্ভর করছে বাংলাদেশ নিজের অর্থনীতিকে কতটা শক্তিশালী, প্রতিযোগিতামূলক এবং স্থিতিস্থাপক হিসেবে গড়ে তুলতে পারছে, তার ওপর।

আরও

ব্রয়লার ১৮৫ টাকা কেজি হলেও ডিমের ডজন ১৩৫ টাকা

চলতি বার্তা

ব্রয়লার ১৮৫ টাকা কেজি হলেও ডিমের ডজন ১৩৫ টাকা

রাজধানীর বাজারে মাংস ও ব্রয়লার মুরগির দাম স্থিতিশীল থাকলেও বেড়েছে ডিমের দাম। সপ্তাহের ব্যবধানে ডজনে ১০ টাকা করে বেড়েছে।...

২০২৬-০৭-১৭ ১১:৫৫

খুলনা-চট্টগ্রাম-সিলেটে ঝোড়ো হাওয়ার আভাস, ঢাকায় হতে পারে বজ্রসহ বৃষ্টি

চলতি বার্তা

খুলনা-চট্টগ্রাম-সিলেটে ঝোড়ো হাওয়ার আভাস, ঢাকায় হতে পারে বজ্রসহ বৃষ্টি

দেশের আটটি অঞ্চলের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টিসহ অস্থায়ী দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে...

২০২৬-০৭-১৭ ১১:৫২

সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে: অর্থমন্ত্রী

চলতি বার্তা

সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে: অর্থমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনায় নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার ও প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপ...

২০২৬-০৭-১৬ ২২:১৫

আফগানিস্তানে জাতিসংঘের সহায়তা মিশনের প্রধান হ‌লেন বাংলাদেশের কূটনীতিক

চলতি বার্তা

আফগানিস্তানে জাতিসংঘের সহায়তা মিশনের প্রধান হ‌লেন বাংলাদেশের কূটনীতিক

আফগানিস্তানে জাতিসংঘের সহায়তা মিশনের (ইউএনএএমএ) নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশের কূটনীতিক রাবাব ফাতিমা।

২০২৬-০৭-১৬ ১৪:০৯